bdstall.com logo

বান্দরবান: সৌন্দর্য্য ও রোমাঞ্চের সম্মিলন (পর্ব-৩)

থানচি উপজেলা:
বান্দরবান শহর থেকে ৭৯ কিমি. দুরে অবস্থিত থানচি উপজেলা। ধারণা করা হয় মারমা শব্দ 'থাইন চৈ' বা 'বিশ্রামের স্থান' থেকে থানচি নামটির উৎপত্তি। বলা হয়ে থাকে যে ১৯৫০ সালে বা তার পূর্বে  নৌপথে চলাচল কালে যাত্রীগণ বিশ্রামের জন্য এ স্থানে থামতেন বলে থাইন চৈ নামে স্থানটি পরিচিত ছিল এবং পরে তা থানচি হিসাবে পরিচিতি  লাভ করে। জাতিগত বৈশিষ্ট্য আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের থানচি উপজেলায়  বাঙ্গালীসহ ১১ টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ উপজেলাটি বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত। কে.এস.মং বর্তমান বোমাং সার্কেলের রাজা। উপজেলার অন্তর্গত সাকা হাফং, নাফাখুম, তিন্দু, বড় পাথর ইত্যাদি স্থান পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত। থানচি যাওয়ার পথে পাহাড়ী রাস্তায় চলার আসল মজাটা পাওয়া যায়।

সাকা হাফং:
বর্তমানে বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক ভাবে সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া হচ্ছে সাকা হাফং (ককবরক ভাষায় র্পূবরে পাহাড়) যা ত্ল্যাং ময় (বম ভাষায় সুন্দর চূড়া), মোদক মুয়াল বা মোদক তোয়াং নামেও পরিচিত। এর উচ্চতা ১,০৫২ মিটার (৩,৪৫১ ফুট)। বাংলাদশে-মায়ানমার সীমান্তে চূড়াটি অবস্থতি।

আনুষ্ঠানকিভাবে সাকা হাফংকে বাংলাদশেরে র্সবোচ্চ চূড়া হিসেবে এখনও ঘোষণা করা হয়নি তবে সাম্প্রতকি তথ্য-উপাত্তরে ভিত্তিতে বলা যায়, সম্ভবত এর চেয়ে বেশি উচ্চতার আর কোন চূড়া বাংলাদেশে নেই। চূড়াটি র্সবপ্রথম জয় করনে ইংরজে র্পবতারোহী জঞ্জি ফুলেন। সেসময় তিনি চূড়াটির উচ্চতা নির্ণয় করেন ১,০৬৪ মিটার। ২০১১ সালে দেশের দুটি অভিযাত্রিকদল দল সাকা হাফং এর উচ্চতা নির্ণয় করেন ৩,৪৮৮ ও ৩,৪৬১ ফুট। বাংলাদশেরে স্বীকৃত র্সবোচ্চ চূড়া কেওক্রাডং (৩,১৭২ ফুট) চেয়েও এর উচ্চতা সকল হিসেবেই অনকে বেশী।

রেমাক্রী বাজার:
মারমা আদিবাসি পরিচালিত রেমাক্রী বাজারটি নাফাখুম যেতে পড়া একটি ছোট্ট বাজার। গ্রামদেশের বাড়ির মতো মাঝখানে বড় উঠোন ও চারপাশে মারমা বসতি। উল্লেখ্য এই বাজারে যাদের দোকান রয়েছে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে দোকানের পেছনে অবস্থিত ঘরগুলোয় বসবাস করেন। রেমাক্রী বাজারের পাশেই পর্যটকদের জন্য একটি রেষ্ট হাউজ রয়েছে। আর রেষ্ট হাউজের পাশে রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প। রেমাক্রী বাজার হতে ২.৩০-৩ ঘন্টার মতো হাটা দুরত্বে নাফাখুম জলপ্রপাত অবস্থিত। রেমাক্রী বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কুল ধরে হেটে নাফাখুম যেতে হয়।

নাফাখুম:
বান্দরবানে অসাধারণ রোমাঞ্চকর একটি অভিযান চালাতে পারেন নাফাখুম এ সৌন্দর্যের নাফাখুম হচ্ছে একটি পাহাড়ি জলপ্রপাত; মারমা ভাষায় ‘খুম’মানে হচ্ছে জলপ্রপাত। রেমাক্রী নদীতে এক ধরনের মাছ পাওয়া যায় যার নাম নাফা মাছ। এই মাছ সবসময় স্রোতের ঠিক বিপরীত দিকে চলে। বিপরীত দিকে চলতে চলতে মাছগুলো যখন লাফিয়ে ঝর্না পার হতে যায় ঠিক তখনই উপজাতীয়রা লাফিয়ে ওঠা মাছগুলোকে জাল বা কাপড় দিয়ে ধরে ফেলে। তাই এই প্রপাতটির নাম দেওয়া হয়েছে নাফাখুম। তিনটি ধাপে নেমে আসা এই জলপ্রপাতটি প্রায় ৩০ ফুট নিচে পতিত হয়ে সূর্যের আলোর সাথে তৈরি করে বর্ণিল রংধনু।

নাফাখুম যেতে হলে বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার মারমা অধ্যুষিত রেমাক্রি এলাকায় চলে যাবেন। সাঙ্গু নদী ধরে রেমাক্রীর দিকে প্রবল স্রোত ভেঙ্গে ধীরে ধীরে নৌকায় করে যেতে হবে। বিষয়টা অনেকটা উপরে ওঠার মত কেননা নদীটা রেমাক্রী হতে থানচির দিকে ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে এসেছে; আর এই কারনেই এখানে এত স্রোত। রেমাক্রি থেকে তিন ঘন্টার হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় নাফাখুম। নাফাখুম যখন পৌঁছাবেন তখন বিশ্বাসই হবে না যে আপনি বাংলাদেশে আছেন, মনে হবে সামনে ডিসকভারি চ্যানেল বা হলিউডি কোন মুভির দৃশ্য দেখছেন।

তিন্দু:
থানচি থেকে নৌকা নিয়ে রেমাক্রির পথে যেতে যেতে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে তিন্দু। পাহাড়-নদী বেষ্টিত সুন্দর একটি স্থান তিন্দু। অনেকে নাফাখুম যাবার পথে থানচি না থেকে তিন্দুতে এসে রাত্রিযাপন করে। থাকার জন্য কিছু ঘর ভাড়া পাবেন আদিবাসি গ্রামে। আর তিন্দুতে একটি বিজিবি ক্যাম্প থাকায় রাত্রিযাপন করাটা নিরাপদ।

বড় পাথর:
তিন্দু হতে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই বড় পাথর, স্থানীয়রা একে রাজা পাথরও বলে থাকে। আসলে এটি একটি বিশাল আকারের পাথর; পাশে আরো বেশকিছু ছোট বড় পাথর নদীর মাঝে পড়ে আছে। ধারণা করা হয় বহু আগে ভূমিকম্পের ফলে পাশের পাহাড় থেকে বিশাল আকারের এই পাথরের টুকরো গুলো নদীর মাঝে এসে পড়েছে। স্থানীয় আদিবাসীরা বিশ্বাস করে যে এই রাজা পাথরকে সম্মান দেখাতে হয়, নইলে পথে দুর্ঘটনা ঘটে। এই কারনে এখানে নৌকা থেকে নেমে হেটে যেতে হয়।

যেভাবে যাবেন নাফাখুম:
বান্দরবন হতে বাস, জীপ বা চান্দের গাড়িতে করে থানচি যেতে হয়। থানচি পৌছানোর পর সেখান থেকে যেতে হবে ক্রেমাক্রী বাজার। থানচি বাজার হতে নাফাখুমে যাওয়ার একমাত্র অবলম্বন ইন্জিনচালিত নৌকা। এই নৌকা ভাড়া করার জন্য পর্যটকদের থানচি ঘাটে অবস্থিত নৌকাচালক সমিতির সাথে কথা বলতে হয় এবং সেখান থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে বিজিবির তালিকাভুক্ত একজন গাইড নিতে হয়। শুধু তাই নয় নৌকাচালক সমিতির অফিসে পর্যটকদের নাম, ঠিকানা, পিতার নাম, মোবাইল নম্বর, নৌকার মাঝির নাম প্রভৃতি রেজিস্টার করে ভ্রমণের অনুমতি নিতে হয়। রেমাক্রী থেকে নাফাখুম যাওয়ার কোনো পরিবহন ব্যবস্থা নেই। অবশিষ্ট পথটুকু পায়ে হেটে পাড়ি দিতে হয়। রেমাক্রী পৌছার পর থানচি বাজার থেকে সাথে নেওয়া গাইডকে রেখে রেমাক্রী থেকে নতুন আরেকজন গাইড সাথে নিতে হয় এবং বিজিবি ক্যাম্পে পর্যটকদের নাম, ঠিকানা রেজিস্ট্রার করে ভ্রমণের অনুমতি নিতে হয়। উল্লেখ্য দিনে গিয়ে দিনেই নাফাখুম জলপ্রপাত থেকে থানচি ফিরে আসাটা কষ্টকর। তাই আপনি চাইলে রেমাক্রীতে রাত্রিযাপন করে চারপাশটা ভালোভাবে ঘুরে ফিরে দেখে আসতে পারেন। আর যারা দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে চান তাদেরকে ভোর ৬/৭ টার মধ্যে থানচি থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। রেমাক্রী বাজার হতে দ্রুত হাটলে ২ ঘন্টা এবং ধীর পায়ে হাটার ক্ষেত্রে নাফাখুম ঝর্নায় পৌছতে ৩ ঘন্টার মতো সময় লেগে যায়।

নাফাথুম যাওয়ার খরচাপাতি:
বান্দরবান হতে থানচি-- বাস-২০০ টাকা, জীপ/চান্দের গাড়ি ৪০০০/৫০০০ টাকা।
থানচি হতে রেমাক্রী নৌকা ভাড়া-৪৫০০ টাকা।
রেমাক্রীতে যতদিন থাকবেন তার প্রতি রাতের জন্য নৌকা ভাড়া বাবদ ১৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত গুণতে হবে।
গাইড (থানচি হতে রেমাক্রী) ৫০০ টাকা।
গাইড (রেমাক্রী হতে নাফাখুম) ৬৫০ টাকা।
খাবার খরচ আপনার ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে; তবে মোটামুটি ১০০/১২০ টাকার মধ্যে প্রতি বেলায় খেতে পারবেন।
থাকার খরচ (থানচি) জনপ্রতি ১০০ টাকা।
থাকার খরচ (রেমাক্রী) জনপ্রতি ৮০-১০০ টাকা।

বান্দরবান: সৌন্দর্য্য ও রোমাঞ্চের সম্মিলন (পর্ব-১)

বান্দরবান: সৌন্দর্য্য ও রোমাঞ্চের সম্মিলন (পর্ব-২)